কল্পনার ভেতর ঢুকে নিজেই দুঃখ খুঁজে নিই।

আমি আমার কল্পনার ভেতর ঢুকে নিজেই দুঃখ খুঁজে নিই।
যেন সুখটা খুব শব্দ করে হাঁটে—আর দুঃখটা চুপিচুপি এসে বসে পাশে।
তারপর সেই দুঃখগুলো আমি আমার ঘরের প্রতিটা কোণে সাজিয়ে রাখি—
বিছানার এক পাশে, জানালার ধারে,
রাতের নিঃশব্দ বাতির আলোয়,
আর আমার বুকের এমন এক জায়গায়—যেখানে কাউকে ঢুকতে দিই না।

আমি জানি, আমি তোমাকে পাবো না।
এই সত্যটা আমি প্রতিদিন জানি,
প্রতিদিন নতুন করে বুঝি।
তুমিও হয়তো কখনোই আমাকে সেইভাবে চাও না—
যেভাবে কেউ কাউকে নিজের শেষ আশ্রয় ভেবে চায়।
এই কথাগুলো আমি অস্বীকার করি না,
শুধু চুপচাপ মেনে নিই।

তবুও…
আমি ভবিষ্যতের দুঃখগুলো এখন থেকেই আগলে রাখি।
যেন তারা একদিন হঠাৎ এসে আমাকে ভেঙে না দেয়।
আগে থেকেই তাদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে নেই,
আগে থেকেই চোখের জল জমিয়ে রাখি—
যাতে হঠাৎ কান্না এলে আর অবাক না হই।

কখনো রাতে শুয়ে ভাবি,
যে মানুষটা আমার জীবনে আসলো না,
তার জন্যই কেন এত শূন্যতা লাগে?
কেন এমন লাগে
সে নেই বলেই আমার ঘরটা এত বড়, এত ফাঁকা?

আমি কাঁদি না জোরে।
আমার কান্না খুব নীরব
চোখের কোণে জমে থাকে,
গলার ভেতর আটকে থাকে,
আর হৃদয়ের গভীরে ধীরে ধীরে ভার হয়ে বসে।

আমি জানি, একদিন এই অভ্যাসটাই আমার হয়ে যাবে।
দুঃখকে ভালোবাসা,
অপেক্ষাকে আশ্রয় বানানো,
আর না পাওয়াকে ভাগ্য বলে মেনে নেওয়া।

সবাই তো এমন কাউকে পায় না,
যাকে চাইলেই পাওয়া যায়।
কিছু মানুষ শুধু কল্পনায় থাকে
আর কিছু দুঃখ থেকে যায় আজীবনের সঙ্গী হয়ে।

ভালোবাসার মানুষ

ভালোবাসার মানুষ পাওয়া কঠিন কিছু না।
চারপাশে তাকালেই কাউকে না কাউকে পাওয়া যায়—
কথা বলা যায়, সময় কাটানো যায়, হাসিও ভাগ করা যায়।

কিন্তু যে মানুষটার কাছে নিজের নামটা রেখে বলা যায়—
“এই মানুষটা আমার”,
যাকে বুঝাতে হয় না কেন মনটা ভার,
যার সামনে শক্ত থাকার ভান করতে হয় না—
এই মানুষটা বিরল।

দিন শেষে সব শব্দ শেষ হয়ে গেলেও
যার পাশে বসে চুপচাপ থাকলেই মন হালকা হয়ে যায়।
সে কাছে থাকুক বা দূরে—
তার একটাই কথা যথেষ্ট:
“চিন্তা করো না, আমি আছি।”

আর সবচেয়ে বড় শান্তিটা আসে তখনই,
যখন কোনো রকম সংকোচ ছাড়াই বুক ভরে বলা যায়—
এই মানুষটা আমার, একান্তই আমার মানুষ।

আমি দুঃখ বিলাসী

আমি দুঃখ বিলাসী।
দুঃখ না থাকলে আমার দিন চলে না।
হাসি এলে আমি সন্দেহ করি,
কিন্তু কষ্ট এলে—
আমি ওকে আপন করে নেই।

দুঃখ বিলাতে আমার ভালো লাগে,
কারণ দুঃখই একমাত্র অনুভূতি
যেটা আমাকে প্রশ্ন করে না,
বদলে কিছু চায় না,
শুধু পাশে বসে থাকে।

আমি জানি—
এই কষ্টগুলো আমাকে ভেঙে দেয়,
তবুও আমি ওদের আগলে রাখি।
কারণ দুঃখ ছাড়া
আমি নিজেকে চিনতে পারি না।

হয়তো এই জন্যই
আমি বারবার এমন মানুষকে ভালোবাসি
যারা আমাকে কষ্ট দিতে জানে,
ভালো থাকতে নয়।

আমি দুঃখ বিলাসী—
আর দুঃখ বিলাতেই
আমার অদ্ভুত রকমের শান্তি।

আমি ভেঙেছি ধীরে ধীরে

আমি ভেঙে পড়িনি হঠাৎ করে,
আমি ধীরে ধীরে ভেঙেছি—
প্রতিদিন একটু একটু করে,
ঠিক সেই মানুষটার জন্য
যার কাছে নিজেকে নিঃশ্বাসের মতো সঁপে দিয়েছিলাম।

নিজেকে ভালোবাসিনি বলেই হয়তো
তাকে ভালোবেসেছি অতিরিক্ত।
নিজের সব অনুভূতি,
সব স্বপ্ন,
সব আশা—
এক এক করে তুলে দিয়েছি তার হাতে।
আর সে?
সে খুব নিঃশব্দে
আমার ভেতরের সবকিছু নিঃশেষ করে দিয়েছে।

ভালোবাসা কি এমনই হয়?
যেখানে নিজের সবটা দিয়ে
শেষে ফিরে পাওয়া যায়
শুধু অবহেলা আর অনাদর?

আমি তো চাইনি কিছু বেশি—
শুধু একটু বোঝা,
একটু থাকা,
একটু ভরসা।
কিন্তু সেটুকুও আমার কপালে ছিল না।

আজ বুঝি,
সবচেয়ে বড় ভুলটা আমি করেছি নিজেকেই হারিয়ে।
কারও ভালোবাসার প্রমাণ হতে গিয়ে
আমি নিজের অস্তিত্বটাই ভুলে গেছি।

এখন আমি ক্লান্ত…
এতটাই ক্লান্ত যে আর অভিযোগ করতেও ইচ্ছে করে না।
শুধু মাঝে মাঝে মনে হয়—
ভালোবাসা যদি এতটা একা করে দেয়,
তাহলে মানুষ কেন বারবার ভালোবাসতে যায়?

আমার জীবনে যত শূন্যতা

বিশ্বাস করো,
আমার জীবনে যত শূন্যতা ছিল—
সবচেয়ে গভীর শূন্যতাটা শুরু হয়েছে তোমাকে হারানোর পর।

তুমি না থাকলে দিনগুলো কেমন জানো?
সকাল আসে ঠিকই,
কিন্তু আলো আসে না।
ঘড়ির কাঁটা চলে,
কিন্তু সময় এগোয় না।

একটা দিন যদি তোমার সাথে কথা না হয়—
আমার বুকের ভেতর এমন একটা চাপ জমে,
যেন শ্বাস নিলেই কষ্ট বাড়ে।
আর যখন বুঝি,
এই কষ্টটা তোমার কাছে বলা যাবে না—
তখন ভেঙে পড়ি সবচেয়ে বেশি।

তুমি না থাকলে
আমার চারপাশের রঙগুলো মরে যায়।
হাসি গুলো ক্লান্ত হয়ে বসে পড়ে,
আর রাতগুলো লম্বা হয়ে যায়—
এতটাই লম্বা যে চোখ বন্ধ করলেও
তোমার স্মৃতিগুলো ঘুমাতে দেয় না।

তখন মনে হয়,
ভালোবাসার পর যদি তোমাকেই হারাতে হয়,
তাহলে এই ভালোবাসা নিয়ে আমি বাঁচবো কীভাবে?

তুমি ছাড়া আমি কেবল একটা শূন্য মানুষ—
একটা বিস্তীর্ণ আকাশ,
যেখানে কোনো তারা নেই,
কোনো সূর্য নেই,
কোনো ভোরের আশা নেই।

সবকিছু ফাঁকা…
নিস্তব্ধ…
অসহ্য রকমের শূন্য।

এই অন্ধকারের ভেতর
একমাত্র আলো ছিল তুমি।
আর আজ,
তোমার নামটাই শুধু
আমার সব কান্নার শেষ ঠিকানা হয়ে আছে…

আমি জানি তুমি একদিন চলে যাবে

আমি জানি—
তুমি একদিন চলে যাবে, আমাকে ছেড়ে।
এই সত্যটা আমি শুরু থেকেই জানতাম।
আমি জানি আমি ঠকবো,
জানি আমার বিশ্বাস, আমার ভালোবাসা—
সব কিছু একদিন ভাঙা কাঁচের মতো পায়ে বিঁধবে।

তবুও জানো…
আমি থামিনি।
আমি আমার পুরো পৃথিবীটা
তোমার নামে লিখে দিয়েছি।

আমার সকালগুলো তোমার নামে শুরু হয়,
রাতগুলো তোমার অপেক্ষায় শেষ হয়।
যে স্বপ্নগুলো নিজের জন্য দেখার কথা ছিল,
সেগুলোও আমি তোমার হাতে তুলে দিয়েছি।
জানি তুমি রাখবে না,
জানি একদিন ফেলে যাবে—
তবুও দিয়ে দিয়েছি,
কারণ আমার ভালোবাসা হিসাব জানে না।

আমি জানি তুমি আমাকে ভাঙবে,
খুব ধীরে, খুব নীরবে।
এমনভাবে ভাঙবে
যেন মানুষ বুঝবেও না আমি ভেঙেছি।
শুধু আমি জানবো,
রাতের অন্ধকারে, বালিশ ভেজা কান্নায়।

তারপরও…
আমি তোমাকে দোষ দিই না।
কারণ আমি জেনেশুনেই
নিজেকে তোমার কাছে হারিয়ে দিয়েছি।
আমার পৃথিবী, আমার সবটা—
আজও তোমার নামেই লেখা।

আমি খুব করে চাই তুমি আমার না হও

জানো প্রিয়,
আমি খুব করে চাই তুমি আমার না হও।
কারণ আমার হয়ে গেলে—আমার ভালোবাসার ভার তুমি সইতে পারবে না।
এই ভালোবাসা হালকা নয়, এটা নিঃশ্বাসের মতো—বাঁচায়, আবার দম বন্ধও করে দেয়।

আমি এমনভাবে ভালোবাসি যে,
তোমার একটুখানি অবহেলাও আমার বুকের ভেতর ঝড় তুলে দেয়।
আর তুমি যদি কখনো আমাকে কষ্ট দাও—
জানো?
সেদিন শুধু আমি ভাঙবো না,
তোমার পুরো দুনিয়াটাই ভূমিকম্পে কেঁপে উঠবে।
কারণ আমি নীরবে কাঁদি,
আর নীরব কান্নার শব্দ সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর।

আমি তোমাকে আগলে রাখতাম আদরে,
মায়ায় ঢেকে দিতাম প্রতিটি ক্ষত,
তোমার খারাপ দিনগুলো নিজের করে নিতাম—
কিন্তু তার বদলে যদি একদিন তুমি ক্লান্ত হয়ে যাও,
একটা কথাও না বলে দূরে সরে যাও—
তাহলে আমার এই বুকভরা ভালোবাসা
তোমার জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়াবে।

তাই জানো প্রিয়,
আমি চাই তুমি আমার না হও।
দূরে থেকেও যদি ভালো থাকো,
তবু সেটাই আমার জন্য শান্তি।
কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি এমনভাবে
যেখানে পাওয়া নয়,
ছেড়ে দিতে পারাটাই সবচেয়ে বড় ভালোবাসা।

কেনো হলেনা আমার

আমি তোমাকে চেয়েছিলাম প্রার্থনার মতো—
শব্দহীন, গভীর, অবিরাম।
আমার সমস্ত দিনলিপির ফাঁকে ফাঁকে
তোমার নাম লিখে রেখেছিলাম
অদৃশ্য কালি দিয়ে।
তবুও কেনো,
নিয়তির পাতায় তোমার পাশে
আমার নামটা লেখা হলো না?

আমি জানতাম—
সব ভালোবাসা প্রাপ্তির জন্য হয় না।
কিছু ভালোবাসা জন্মায়
শুধু হারানোর জন্য,
শুধু সহ্য করার জন্য।
তবুও আমি বোকামির মতো ভেবেছিলাম—
এই একবার হয়তো
নিয়ম ভাঙবে ঈশ্বর।

তুমি চলে গেলে নিঃশব্দে,
কোনো বিদায়ের বাক্য না রেখে।
আমার ভেতর তখন
একটা সভ্যতার পতন হলো—
শব্দ ভেঙে গেল,
বিশ্বাস ধ্বসে পড়ল,
আর হৃদয়টা দাঁড়িয়ে রইল
ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে।

আজও আমি প্রশ্ন করি না—
তুমি কেনো চলে গেলে।
আমি শুধু নিজেকেই জিজ্ঞেস করি—
আমি যদি এতটা তোমার হতে পারি,
তুমি কেনো একটুখানিও
আমার হলে না?

এই প্রশ্নটাই আমার শাস্তি।
এই প্রশ্নটাই আমার কবিতা।
আর এই প্রশ্নের ভার নিয়েই
আমি প্রতিদিন বেঁচে থাকি—
একজন মানুষ হয়ে নয়,
একটা অপূর্ণ ভালোবাসা হয়ে।

প্রিয়তমার গলির রাস্তা ধরে

প্রিয়তমার গলির রাস্তা ধরেই
একদিন আমার জানাজা বের হবে।
যে পথে একদিন আমি অপেক্ষা নিয়ে হেঁটেছি,
আজ সেই পথেই আমাকে নিয়ে যাবে
নীরব কাঁধ আর চাপা দীর্ঘশ্বাস।

সে হয়তো জানবেও না—
এই মৃত মানুষটা কোনো এক সময়
তার নামেই বেঁচে ছিল।
তার জানালার আলো গুনে
রাত পার করতো,
তার একটুখানি হাসির জন্য
নিজেকে প্রতিদিন ভেঙে দিত।

জানাজা যাবে,
আর আমি শুয়ে থাকবো নিঃশব্দে—
আর কোনো অভিযোগ নেই,
আর কোনো “কেনো” নেই।
যে বুকটা একসময় তার নামে ধড়ফড় করতো,
সেটা তখন শান্ত,
ভয়ংকর রকম শান্ত।

হয়তো সে দূর থেকে তাকাবে,
চিনতেও পারবে না।
চিনলেও কিছু বলবে না—
কারণ মৃত ভালোবাসার সাথে
কথা বলা যায় না।

তবুও,
প্রিয়তমার গলির এই রাস্তা জানবে—
এই লাশটা কোনোদিন
অপরাধী ছিল না,
শুধু খুব বেশি ভালোবেসেছিল।

আর জানাজা চলে গেলে,
রাস্তাটা আবার আগের মতো হয়ে যাবে।
শুধু বাতাসের ভেতর
একটা নাম কাঁপতে থাকবে—
যে নামটা কোনোদিন
তার ছিল না,
তবুও তার জন্যই
সবচেয়ে বেশি মরেছিল।

খোদা আমার কপালে দুঃখ লিখে রেখেছেন শত শত

খোদা আমার কপালে দুঃখ লিখে রেখেছেন শত শত
আর সেই সব দুঃখ সহ্য করার মতো
আমাকে দিয়েছেন মাত্র একটা হৃদয়।

এই হৃদয়টা খুব ছোট, খুব নরম।
একটার পর একটা আঘাতে
এটা আর্তনাদ করে,
তবুও ভাঙে না—
কারণ ভেঙে গেলে তো
আর কাঁদার সুযোগও থাকতো না।

আমি প্রতিদিন কিছু দুঃখ
চুপচাপ গিলে ফেলি,
কিছু দুঃখ রাতের বালিশে রেখে দিই,
আর কিছু দুঃখ এমনভাবে বুকের ভেতর জমে থাকে
যার কোনো ভাষা হয় না—
শুধু নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে।

খোদা হয়তো ভেবেছিলেন,
আমি পারবো।
তাই একটার পর একটা বোঝা চাপিয়েছেন—
ভালোবাসার দুঃখ,
বিশ্বাসের দুঃখ,
না-পাওয়ার দুঃখ,
আর মানুষের মতো না হতে পারার দুঃখ।

এই একটা হৃদয়েই
আমি সবাইকে জায়গা দিয়েছি,
নিজেকে রাখার জায়গা রাখিনি।
তাই তো এতটা ব্যথা হলে
কেউ টের পায় না—
আমি শুধু একটু চুপ হয়ে যাই।

তবুও খোদা,
যদি কখনো দয়া করে তাকাও—
এই ক্লান্ত হৃদয়টার দিকে তাকিও।
শত শত দুঃখের ভার বইতে বইতে
এটা আজ শুধু একটা প্রার্থনা হয়ে গেছে—
আর কিছু না,
শুধু একটু শান্তি চায়।